ক্ল্যাসিকাল ব্যাটিং আর নিখুঁত টাইমিংয়ে ছক্কা হাঁকানোর দৃষ্টিনন্দন উদাহরণ যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটে কেউ হয়ে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তানজিদ তামিম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জোরের উপর নির্ভর না করে, সহজ অথচ কার্যকর ভঙ্গিমায় ছক্কা মারার যে শিল্প, সেটা যেন তার ব্যাটেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়।
২০২৫ সাল এখনো শেষ হয়নি, অথচ, এরইমধ্যে এই বছরে তানজিদ হাঁকিয়েছেন ৫৫টি ছক্কা, তাও আবার মোটে ২০টি ম্যাচ খেলে! এই পরিসংখ্যান তাকে বসিয়ে দিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের বড় বড় পাওয়ার হিটারদের পাশে। নিকোলাস পুরান, ব্রেভিস, ফিন অ্যালেন কিংবা কাইল মায়ার্সদের মতো বিখ্যাত ছক্কাবাজদের তালিকাতেই জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ এই ওপেনার। ২০ ইনিংসে ৫৫ ছক্কা, অর্থাৎ, প্রতিটি ইনিংসে গড়ে প্রায় ৩টি ছক্কার মতো! এতেই তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের ছক্কা ইস্পেশালিস্ট ।
এছাড়া এ বছরের ৯টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তানজিদের ছক্কা সংখ্যা ২১টি, যেখানে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তার চেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকিয়েছেন কেবল অভিষেক শর্মা। বাকি ১১ ম্যাচে বিপিএলে ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে খেলেছেন, সেখানে এসেছে ৩৪টি ছক্কা।
এতসব অর্জনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তানজিদ এখন আরেকটি রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশের হয়ে এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি টি-টোয়েন্টি ছক্কার রেকর্ড এখন তাওহীদ হৃদয়ের দখলে, ২০২৪ সালে টাইগারদের তারকা এই ব্যাটার হাকিয়েছিলেন ৫৬টি ছক্কা। আর তানজিদের সংগ্রহ এখন ৫৫টি। মাত্র দুইটি ছক্কাই তাঁকে বসিয়ে দেবে নতুন রেকর্ডের পাশে।
ছক্কার পাশাপাশি রানের দিক থেকেও প্রশংসার দাবিদার তানজিদ। চলতি বছর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে তিনটি ভিন্ন দলের বিপক্ষে তিনটি সিরিজে রান করেছেন ৩০৯। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে করেছেন ১০৯, পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০৬ এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯৪।
এর মধ্যে পাকিস্তান সফরে কোনো ফিফটি না থাকলেও আছে ৩টি ত্রিশোর্ধ্ব ইনিংস। বাকি দুই সিরিজেই অন্তত ১টি হলেও ফিফটি হাকিয়েছেন। আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ৭৩ রানে অপরাজিত থেকে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো লঙ্কানদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০২৪ সালে তানজিদ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ৩১টি ম্যাচ, ছক্কা ছিল ৩৩টি। চলতি বছর ২০টি ম্যাচে এসেছে ৫৫ ছক্কা। অর্থাৎ দেড় বছরে ৫১ ম্যাচে তার ছক্কা সংখ্যা ৮৮! বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা বিস্ময়কর, রীতিমতো ‘অবিশ্বাস্য’ বলা চলে।
একটা সময় মনে করা হতো, বাংলাদেশে পাওয়ার হিটারের অভাব আছে। কিন্তু, তানজিদের মতো কেউ যখন সহজ ব্যাকলিফটেই বলকে সীমানার বাইরে পাঠান, তখন সেই ধারণা বদলাতে বাধ্য। তিনি প্রমাণ করে দিচ্ছেন, ছক্কা হাঁকানোর জন্য শুধু শক্তি নয়, দরকার বুদ্ধিমত্তা, টাইমিং আর আত্মবিশ্বাস।
তানজিদের এই ছক্কাময় অভিযাত্রা যদি এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তবে ভবিষ্যতে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে তিনি হবেন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সম্পদ। ছক্কার এই ছন্দই একদিন তাকে পরিণত করতে পারে, বাংলাদেশের একজন হয়েও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছক্কার রাজপুত্রে।

Post a Comment