সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে : বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক এখন মাছ বাজারে কাজ করছে!


ক্রিকেটবিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে কয়েক বছরে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের আয়ও এখন বেশ ভালো। সর্বোচ্চ বেতন চার লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ছয় লাখ টাকা। সর্বনিম্ন বেতন ৭৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ টাকা। ঘরোয়া ক্রিকেট আর বোনাস থেকেও খেলোয়াড়দের আয় কম নয়। ফলে ক্রিকেটারদের অর্থেবিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠা কোনো বিস্ময় নয়।


কিন্তু বিস্ময়কর হলো, মাশরাফী-সাকিবদের মতো দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলেও দুবেলা খাবার জোটাতে মাছের আড়তে কাজ করতে হচ্ছে বরিশাল নগরীর বাসিন্দা আলম খানকে। শুধু তফাৎ একটাই, তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দারিদ্র্যের কারণে ক্রিকেট খেলার নেশাটা তার কাছে বিলাসিতা। বাবা কম বকাঝকা করেননি, পিটুনিও খেয়েছেন অনেক। ক্রিকেট ছাড়ার শপথও নিতে হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আলমের মাথা থেকে ক্রিকেটের ভূত নামেনি বরং ক্রমশ বেড়েছে। তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ক্রিকেট। তাই ক্রিকেট খেলেই সংসারের হাল ধরেছেন ৩১ বছরের যুবক আলম।


বাবা কালু খান ছিলেন সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে বরিশাল নগরীতে খাবার হোটেল চালাতেন তিনি। ওই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলত। ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ সালে মারা যান বাবা। বাবার মৃত্যুতে সব এলোমেলো হয়ে যায় আলমের। ঘোর অন্ধকার নেমে আসে পরিবারে, থমকে যায় আলমের জীবন। পাঁচ সদস্যের সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।


কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধী আলমকে কে দেবে কাজ? কাজ না পাওয়ার হতাশা আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় নিজেকে নিয়ে কী করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। অনেক কষ্টে বিভিন্ন জনের কাছে ধরনা দিয়ে নগরীর পোর্ট রোডের একটি মাছের আড়তে কাজ পান আলম। মাছের আড়তের কর্মচারীর ক-টাকাই বা বেতন। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় প্রতি মাসেই। সংসার চালানো মানে, দুবেলা ভাতের ব্যবস্থা করা।


শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও পরিবারের দুবেলা খাবার জোগাতে কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে জাতীয় দলে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করা আলমকে। আলম খানের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কোটখালী গ্রামে। জীবিকার সন্ধানে প্রায় দুই যুগ আগে আলমের পরিবার চলে আসে বরিশাল নগরীতে। এখন থাকেন নগরীর বটতলা বাজার সংলগ্ন রাজু মিয়ার পোল এলাকায় টিনের চালায় টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি জীর্ণ দুটি কক্ষে। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় আলম। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করা আলম খানের জীবন সংগ্রামের গল্পটি এমনই। তার নেতৃত্বে দেশ ও বিদেশের মাটিতে ১১টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল। এর মধ্যে ৭টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।


একসময় অধিনায়ক পদবি তার জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালের শেষদিকে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন আলম। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বিশেষ পারদর্শী আলম। ব্যাট হাতে একাই ম্যাচ জিতিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তিনি। ডানহাতি অফস্পিনে মাপা লাইন-লেন্থের বোলিংয়ে প্রতিপক্ষের রানের চাকা আটকে দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক থ্রু এনে দিতে পারেন।


দারিদ্র্য ও শারীরিক অক্ষমতাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়া আলম খানের সঙ্গে নগরীর পোর্ট রোডের একটি মাছের আড়তে বসে কথা হয়। আলাপকালে আলম শোনালেন তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি, জানালেন ক্রিকেট নিয়ে তার স্বপ্ন আর বেড়ে ওঠার কথা।


আলম বলেন, ১৯৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর আমার জন্ম। জন্মের পর ভালোই ছিলাম। কিন্তু সাড়ে তিন মাস বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হই। বড় হয়ে শুনেছি, প্রচণ্ড জ্বর ছিল বেশ কয়েকদিন। এরপর শরীরের নিচের অংশ শুকিয়ে যেতে থাকে, বাঁকা হতে শুরু করে দু’পায়ের পাতা। এ অবস্থায় বাবা-মা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। নানা জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন, কিন্তু লাভ হয়নি। পায়ে শক্তি না থাকায় ৯ বছর পর্যন্ত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। এরপর ধীরে ধীরে দাঁড়াতে পারলাম, পায়ে কিছুটা জোর পেলাম।


এর আগেই সংসারে অভাব ঘিরে ধরল। অভাবের জন্য পেট ভরে তিনবেলা ঠিকমতো ভাতই জুটত না। তখন বাবা, মা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে। শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। নগরীতে একটি ঘর ভাড়া নেন। পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবার জোগাড়ে রাস্তার পাশে ছোট একটি খাবার দোকান দিয়ে বসেন বাবা। তখন আলমের বয়স ৭-৮ হবে, ছোট ভাইয়ের ১-২ বছর। অনেক ঘুরে বেসরকারি একটি কারখানায় কাজ পেয়ে যান তার বাবা। তার উপার্জনে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছিল সংসারে।


জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার আলম বলেন, এক পা, দু-পা করে ১২ বছর বয়সে হাঁটতে শিখি। তখন বাবা স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মাঠে ক্রিকেট খেলতে দেখতাম কিশোরদের। এরপর মাঝে মাঝেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খেলা দেখতাম। প্রথমে বল কুড়িয়ে দিতাম। একদিন লোকজন কম থাকায় খেলার সুযোগ পেয়ে যাই। টেনিস বল দিয়েই ক্রিকেটে হাতেখড়ি। টেনিস থেকে ফাইভ স্টার, এরপর টেপ টেনিসে। এরপর নিজ এলাকার হয়ে বিভিন্ন পাড়ার সঙ্গে খেলতে শুরু করি। শৈশবে ক্রিকেট খেলার কারণে বাবার হাতে অনেক পিটুনি খেতে হয়েছে। মা আমার খেলা পছন্দ করতেন। লুকিয়ে ব্যাট-বল কিনতে টাকা দিতেন। ক্রিকেটই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। অভাব আর ক্রিকেট খেলার কারণে এসএসসি পাসের পর কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি।


তিনি বলেন, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সারা দেশ থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে বের করতে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) নেয় বেশকিছু কার্যকরী উদ্যোগ। খেলোয়াড় নির্বাচন করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিসিবি, বিকেএসপি ও বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করা হয় এক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি।


এ কর্মসূচিতে অংশ নেন মোট ১৫৬ জন ক্রিকেটার। পরে সেখান থেকে ২০ ক্রিকেটারকে নিয়ে বিকেএসপিতে চলে যাচাই-বাছাই। সেখান থেকে নির্বাচন করা হয় ১৫ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড। বাছাইয়ে ব্যাটে-বলে দারুণ করেছিলেন আলম। চূড়ান্ত স্কোয়াডে প্রথমদিকে নাম ছিল তার। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আইসিআরসি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দলের অধিনায়ক করা হয় আলমকে।


আলম বলেন, বাবা-মা সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন। স্বপ্ন ছিল তাদের ভালো থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার। ভাগ্য সেই স্বপ্নপূরণ হতে দেয়নি। ২০০০ সালের পর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারখানার চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। এরপর ছোট একটি খাবার হোটেল দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ফুসফুস ক্যান্সারে ধুঁকে ধুঁকে ২০১৮ সালে বাবা মারা যান। বাবার চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বল গ্রামের ভিটেমাটিটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। এক বছরের মাথায় ২০১৯ সালে বাবার পর মাও পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। অনেকটা বাধ্য হয়েই ওই বছর গ্রামের এক মেয়েকে বিয়ে করি। এখন ছোট ভাই, স্ত্রী, আরেক মামাতো ভাইসহ সংসারে সদস্যের সংখ্যা চারজন।

Post a Comment

Previous Post Next Post