বাংলাদেশ এক সময়ের ওয়ানডে সুপারস্পেশালিস্ট দল। যে ফরম্যাটেও এক যুগ আগেও যাদের ছন্দ ছিল চোখে পড়ার মতো- সেই দল এখন ছন্দহীন, কাঠামোবিহীন ও আত্মবিশ্বাসহীন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজ তাই শুধু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সিরিজ নয়, বরং অনেকটা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
বর্তমান বাংলাদেশ ওয়ানডে দল তিনটি মূল দিক-ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিনটিতেই দৃশ্যত অফফর্মে আছে। ওয়ানডে ফরম্যাটে যেখানে ধারাবাহিকতা এবং পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি, সেখানে বারবার দলীয় ব্যর্থতা কেবল হারের কারণই নয়, আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরার কারণ হয়ে উঠেছে। উইকেট স্পিনিং হোক বা স্পোর্টিং—বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ এখন কোনো অবস্থাতেই নির্ভরযোগ্য নয়। উদ্বোধনী জুটি নিয়ে স্থায়ী সমাধান এখনো মেলেনি, মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতা থাকলেও নেই ম্যাচ জেতানো সক্ষমতা। তরুণরা সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারছে না।
একসময় স্পিনে ম্যাচের মোড় ঘোরানো বাংলাদেশ এখন স্পিনিং কন্ডিশনেও তেমন সুবিধা করতে পারছে না। পেস বিভাগেও ধারাবাহিকতার অভাব প্রকট। তাসকিন- মুস্তাফিজুরের পর নতুন নতুন বোলার এলেও কেউই নিজের জায়গা পাকা করতে পারছে না। পেস-স্পিনের সমন্বয়, উইকেট টেকিং বোলার, ডেথ ওভারে দক্ষতা—সবই প্রশ্নবিদ্ধ। আধুনিক ক্রিকেটে ফিল্ডিং একটি বড় পার্থক্য তৈরি করে, আর সেখানেই বাংলাদেশ দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। সহজ ক্যাচ ছাড়া, রান আউট মিস, ফিল্ডিংয়ে মনোযোগের ঘাটতি ম্যাচ ঘোরাতে ব্যর্থ করছে দলকে।
বাংলাদেশ এখন একটি তরুণ দল, তবে সেই তরুণ দল কীভাবে তৈরি হলো সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খেলোয়াড়দের হঠাৎ বাদ দেওয়া, ঘন ঘন স্কোয়াড পরিবর্তন, ম্যাচ টু ম্যাচে নতুন মুখ যোগ করার প্রবণতা দলকে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে না বরং আরও দুর্বল করছে। যে খেলোয়াড়রা দলে থাকছে, তাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুপস্থিত। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন এক অস্থির সময় পার করছে। দল হারছে, ধারাবাহিকতা নেই, আর মাঠের বাইরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক প্রশ্ন। এর মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে ভালো করা খেলোয়াড়রা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছেন কেন?
নুরুল হাসান সোহান, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের মতো পারফরমাররা দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া এবং কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রমাণ দিয়েছেন নিজের যোগ্যতা। বিশেষ করে সোহান উইকেটরক্ষক হিসেবে ধারাবাহিক, নেতৃত্বগুণসম্পন্ন এবং লোয়ার অর্ডারে কার্যকর ব্যাটসম্যান হিসেবেও বিবেচিত। সৈকত একজন কার্যকর অলরাউন্ডার, যিনি দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এদের জায়গা হচ্ছে না মূল দলে, এমনকি স্কোয়াডেও!
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য খেলোয়াড়রা যতটা দায়ী, ঠিক ততটাই দায়ী টিম ম্যানেজমেন্ট ও নির্বাচক কমিটি। পরিকল্পনার অভাব, ঘনঘন একাদশ পরিবর্তন, তরুণদের নিয়ে পরিষ্কার রোডম্যাপের অভাব, সব মিলিয়ে দলের ভেতরেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এমনকি প্রশ্ন উঠছে, কেন বাংলাদেশ নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে পারছে না? ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করা অনেকেই জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছে না, অথবা পেয়েও পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না নিজেদের মেলে ধরার। “ট্যালেন্টের অভাব” বলা যতটা সহজ, তার চেয়ে বেশি দায়ী ব্যবস্থাপনাগত দৈন্য।
সবকিছু মিলিয়ে একটি অস্পষ্ট ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে দলটি। উন্নত ক্রিকেট সংস্কৃতিতে যেখানে একটি সুসংহত সিস্টেম তরুণদের গড়ে তোলে, বাংলাদেশ সেখানে হাঁটছে দিন-মাফিক পরিকল্পনায়।
প্রতিবারই ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে কর্তারা বলেন, পারফরম্যান্সই একমাত্র মানদণ্ড। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ঘরোয়া আসরে ধারাবাহিক পারফরমারদের বদলে এমন কিছু খেলোয়াড় বারবার সুযোগ পাচ্ছেন যারা আন্তর্জাতিক ম্যাচে বারবার ব্যর্থ হয়েও দলে থাকছেন শুধুমাত্র পরিচিতি বা ‘পোটেনশিয়াল’-এর ওপর ভর করে। এই প্রবণতা কেবল প্রতিভার অপচয় নয়, দলের ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে, তারা আন্তর্জাতিক স্বপ্ন হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সাবস্টিটিউট তৈরির রীতিমতো অভাব। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি আফগানিস্তানও এখন এমন দল তৈরি করছে যেখানে একজন খেলোয়াড় ইনজুরি বা অফফর্মে থাকলে সহজেই তার বিকল্প তৈরি থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এমন পর্যাপ্ত বিকল্প নেই। কেউ বাদ পড়লে একেবারে হঠাৎ নতুন মুখ এনে মাঠে নামানো হয়—যার ফলে না সে মানসিকভাবে প্রস্তুত, না দল তার উপর আস্থা রাখতে পারে। ক্রিকেটে "ব্যাকআপ" শব্দটি শুধুই কাগজে আছে, বাস্তবে কার্যকর নয়।
দলে জায়গা পাওয়ার মানদণ্ড কি এখনো স্পষ্ট? প্রশ্নটা এখানেই—জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার মানদণ্ড কী? যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করেও দলে জায়গা না হয়, তাহলে কিসের ভিত্তিতে খেলোয়াড় বাছাই হচ্ছে? নির্বাচকদের বিবেচনা কি শুধু পরিচিত মুখ, সামাজিক চাপ, কিংবা একান্ত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল? এই অনিশ্চয়তা তরুণ ও অভিজ্ঞ, উভয় প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
তরুণ দল তৈরি, কিন্তু তারা কি প্রস্তুত? বর্তমানে যে তরুণ দল মাঠে নামছে, তারা অনেকেই টেকনিক্যালি সক্ষম হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। মিডিয়া চাপ, দর্শক প্রত্যাশা, ম্যাচ পরিস্থিতি—এই বাস্তবতা সামলানো সহজ নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনেক তরুণ ব্যাটাররা ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝড় তুললেও আন্তর্জাতিক ম্যাচে বারবার ধসের কারণ হচ্ছেন।
তাদের ব্যর্থতার দায় তারা একা নিতে পারে না। দায় নিতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে, যাদের দায়িত্ব ছিল ধাপে ধাপে তরুণদের প্রস্তুত করা—‘এ’ দল, হাই পারফরম্যান্স ইউনিট, ঘরোয়া ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা এবং মানসিক সহায়তার মাধ্যমে।
ভবিষ্যতের ক্রিকেটে জবাবদিহি জরুরি। বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন যে অবস্থায় আছে, সেখানে ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে, নির্বাচন প্রক্রিয়া, খেলোয়াড় বিকাশ এবং স্কোয়াড গঠনের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা আনতে হবে।
তাই সোহান বা সৈকতের মতো ক্রিকেটারদের উপেক্ষা করা মানে শুধু একজন প্লেয়ারকে নয়, একটি বিকল্পকে হারানো। ঘরোয়া ক্রিকেটারদের প্রাপ্য সম্মান না রাখা, তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ব্যবস্থা না রাখা মানে ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বহীনতা। এখন সময়, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) পরিকল্পনামাফিক একটি গঠনমূলক এবং ন্যায়সংগত দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার। নইলে প্রতিভা থাকলেও ভবিষ্যৎ বারবার ব্যর্থতায় ঢাকা পড়বে।

Post a Comment