“বাবা, অনেক ইচ্ছা ছিলো, অনেক বড় হব, ভালো কিছু করবো। কিন্তু হতে পারি নাই, মাফ করে দিও। আমি বাঁচতে চাইছি, কিন্তু আমাকে বাঁচতে দিল না। হেডমাস্টারের ভাইয়ের মেয়ে ফেল করলেও তাকে উঠানো হইছে। কিন্তু আমাদের হয়নি; আমার মৃত্যুর পর হলেও এর প্রতিশোধ নেওয়া হোক। ‘সাওদা’-তুশি সব জানে। ইতি তোমার মা (মৌ)।”
ছাদের একটি দেয়ালে এলোমেলোভাবে ১৯ লাইনে এসব কথা লিখে দশতলা থেকে লাফ দেয় সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার মৌ। ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বর দুপুর পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুর থানাধীন ২৩৭-২৩৮ নম্বর ভবন ‘নকশি ভিলা’র নিচে মেলে ওই কিশোরীর নিথর দেহ।
২০১৮ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছিল মেধাবী মৌ। ২০২১ সালে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে সব কিছুই চলছিল ঠিকঠাক। হঠাৎ এমন কী ঘটল? সুইসাইডাল নোট লিখে মেধাবী ওই ছাত্রীকে করতে হলো আত্মহত্যা। ঘটনার আদ্যোপান্ত খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীর রমনা থানাধীন নিউ বেইলি রোডে অবস্থিত স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব হওয়া এবং ন্যায্য বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো স্বজনদের সামনে অপমাণিত হতে হয়
মৌকে। এটি সইতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছে এ কিশোরী। প্ররোচনার কারণে মৌ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেÑ এমন অভিযোগ নিয়ে মাসের পর মাস প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন নিহতের মা শাহনাজ বেগম, তার সহপাঠী ও স্বজনরা। শাহজাহানপুর থানা পুলিশের কাছেও গিয়েছেন মামলা করতে। কিন্তু সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলা করতে পারেনি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গত ৩ সেপ্টেম্বর মেয়ের আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা করেছেন মৌয়ের মা শাহনাজ বেগম। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এ অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে গতকাল শুক্রবার বিকালে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহাব উদ্দিন মোল্লা আমাদের সময়কে বলেন, যেহেতু এ বিষয়ে মামলা হয়েছে, তাই ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে আমি কিছু বলব না। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে একপর্যায়ে তিনি মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেন।
টেবিলে থরে থরে সাজানো মৌয়ের বই-খাতা। আলমারিতে এখনও সাজানো তার জামা-কাপড়। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তার সেই বই-খাতা আর পরিধেয় কাপড় হাতড়েই এখন দিন কাটছে মামলার বাদী শাহনাজ বেগমের। গতকাল মৌয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি।
শাহনাজ বেগম জানান, ২০২২ সালে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌয়ের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। ১৭ নভেম্বর জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় প্রশ্নপত্রে কয়েকটি ছোট দাগ কাটে মৌ। বিষয়টি দেখতে পেয়ে মৌয়ের খাতাটি কেড়ে নেন দায়িত্বরত শিক্ষিকা আঁখি আক্তার। আধা ঘণ্টা পর মৌ ওই শিক্ষিকার কাছে অনেক অনুনয় করলেও খাতা ফেরত পায়নি। উপায়ান্তর না পেয়ে মৌ সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করে। কিন্তু তারা কর্ণপাত করেননি। ওকে উল্টো পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। বাসায় এসে মৌ তার বড় ভাই মো. মুরাদকে ঘটনা জানালে তিনি বোনকে নিয়ে দ্রুত স্কুলের টিচার্স রুমে যান। তিনি প্রধান শিক্ষকের কাছে মৌয়ের পরীক্ষার খাতা ফেরত দেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানান। এতে মন গলেনি শিক্ষকদের। উল্টো প্রধান শিক্ষক মৌয়ের সামনেই মুরাদকে অকথ্য ভাষায় অপমান-অপদস্ত করেন। পরে পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে মৌকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেন। এ সময়ের মধ্যেই মৌ পাস মার্কেরও বেশি প্রশ্নের-উত্তর ও এমসিকিউ লিখে খাতা জমা দেয়। কিন্তু পরীক্ষার ফল সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌয়ের মা দেখতে পানÑ ইংরেজি, গণিত ও জীববিজ্ঞানে তার মেয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। মৌ এসব বিষয়ের উত্তরপত্র দেখতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মৌয়ের মাকেও মেয়ের সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং মা-মেয়েকে রুম থেকে বের করে দেন। মৌ তার মামা মোস্তফা কামালের সঙ্গে ভর্তির শেষ কার্যদিবস ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ভাগ্নির খাতা পুনঃমূল্যায়ন করে মৌকে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে প্রধান শিক্ষক খাতা মূল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সাফ জানিয়ে দেন, সম্ভব নয়। এ সময় মৌয়ের মামা প্রধান শিক্ষককে বলেনÑ ‘আপনার ভাতিজি (সাওদা) পরীক্ষায় পাস না করা সত্ত্বেও আপনি তাকে দশম শ্রেণিতে ভর্তি নিয়েছেন, কিন্তু আমার ভাগ্নিকে কেন ভর্তি নেবেন না?’ এমন প্রশ্নে শিক্ষক তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং মৌ ও ওর মামার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। হুমকি দেন মৌকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার।
শাহনাজ বেগম আরও জানান, কোনো কিছু করতে না পেরে বিমর্ষ মৌকে ওর মামা সেদিন দুপুরে বাসায় পৌঁছে দেয়। বাসায় এসে মৌ তার মাকে বলেÑ ‘সাওদা (প্রধান শিক্ষকের ভাতিজি) বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করা সত্ত্বেও তাকে দশম শ্রেণিতে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাকে ভর্তি নিলেন না।’ এরপর সে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতে থাকে। মেয়েকে নানাভাবে সান্ত¦না দিলেও কান্না থামছিল না ওর। একপর্যায়ে মৌ স্কুলের শিক্ষকদের এই অনিয়ম, অপমান সহ্য করতে না পেরে দুপুর পৌনে ২টার দিকে দশতলা ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার আগে মৌ ছাদের পাশের একটি দেয়ালে প্রধান শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে একটি সুইসাইডাল নোট লিখে যায়। বিষয়টি জানতে পেরে প্রধান শিক্ষক দ্রুত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শাজাহানপুর থানায় ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’ হিসেবে মামলা না নেওয়ার জন্য থানার ওসিসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের বাধ্য করেন। ফলে থানায় দেওয়া আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগটি জিআর মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে একটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রুজু হয়। পরবর্তী সময় ওই মামলায় তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রধান শিক্ষক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দিতে বাধ্য করেন। মৌয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী সব শিক্ষককে এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে জড়িত সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করার জোর দাবি জানান মামলার বাদী শাহনাজ বেগম।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই (ঢাকা-দক্ষিণ) জাহিদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার মৌয়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।

Post a Comment