যে কারণে আইসিসির হল অব ফেমে স্থান পেলো নতুন ৭ কিংবদন্তি! জেনে নিন তাদের অর্জন!

 



আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাদের ‘হল অব ফেম’-এ নতুন করে সাতজন কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সোমবার (৯ জুন)লন্ডনের ঐতিহাসিক অ্যাবি রোড স্টুডিওতে এক জমকালো অনুষ্ঠানে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ এই ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় আরও সাতটি নাম চিরস্থায়ীভাবে জায়গা করে নিল।

আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ বলেন,‘আইসিসি হল অব ফেমের মাধ্যমে আমরা সেই সব অসাধারণ ক্রিকেটারকে শ্রদ্ধা জানাই, যারা তাদের পারফরম্যান্স দিয়ে ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এ বছর আমরা সাতজন সত্যিকারের অসাধারণ খেলোয়াড়কে এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় যুক্ত করতে পেরে গর্বিত। তাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই এবং আশা করি এই স্বীকৃতি তাদের ক্রিকেট-জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’


আইসিসির হল অব ফেমে স্থান পাওয়া নতুন ৭ কিংবদন্তি এবং তাদের অর্জন:


১. ম্যাথু হেইডেন (অস্ট্রেলিয়া):

অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ওপেনার ম্যাথু হেইডেন তার সাহসী ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত। তিনি ১০৩ টেস্টে ৩০ সেঞ্চুরিসহ ৮,৬২৫ রান করেছেন (গড় ৫০.৭৩)। ওয়ানডেতে ১৬১ ম্যাচে ৬,১৩৩ রান (গড় ৪৩.৮০) এবং ৯ টি-টোয়েন্টিতে ৩০৮ রান (গড় ৫১.৩৩) করেছেন। ২০০৭ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়া ছাড়াও, তিনি দুটি বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে ধারাভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত হেইডেন বলেছেন,‘হল অব ফেমে আমি যাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম, তাদের অনেকেই আমার হিরো। এ স্বীকৃতি পাওয়াটা দারুণ এক অনুভূতি।’



২. হাশিম আমলা (দক্ষিণ আফ্রিকা):

দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হাশিম আমলা প্রতিটি ফরম্যাটেই তার ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং দিয়ে মুগ্ধ করেছেন। তার পরিসংখ্যানই তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। টেস্টে তিনি ১২৪ ম্যাচে ৪৬.৬৪ গড়ে করেছেন ৯ হাজার ২৮২ রান, ওয়ানডেতে ১৮১ ম্যাচে ৪৯.৪৬ গড়ে করেছেন ৮ হাজার ১১৩ রান, টি-টোয়েন্টিতে ৪৪ ম্যাচে ৩৩.৬০ গরে করেছেন ১ হাজার ২৭৭ রান। 


২০১২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ৩১১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা ৫৫, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটারদের কাতারে স্থান দিয়েছে।

আইসিসি হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমলা তার গর্বের কথা জানিয়েছেন, সাবেক সতীর্থ গ্রায়েম স্মিথের সঙ্গে এই সম্মান ভাগ করে নেওয়াটা তার জন্য অত্যন্ত বিশেষ মুহূর্ত।


৩. এমএস ধোনি (ভারত):

ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ক্যাপ্টেন কুল’ এমএস ধোনি তার অনন্য নেতৃত্ব এবং ফিনিশিং ক্ষমতার জন্য পরিচিত। তার অধিনায়কত্বে ভারত ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি—এই তিনটি আইসিসি সাদা বলের টুর্নামেন্ট জিতে ইতিহাস গড়েছে। তার ‘হেলিকপ্টার শট’ দিয়ে ২০১১ বিশ্বকাপ জেতার দৃশ্য আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে অমলিন। ধোনি বলেন,‘আইসিসি হল অব ফেমে নিজের নাম দেখতে পারাটা গর্বের। এটা আমার ক্রিকেট-জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে।’


৪. গ্রায়েম স্মিথ (দক্ষিণ আফ্রিকা):

মাত্র ২২ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়কত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘ সময় ধরে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন গ্রায়েম স্মিথ। ব্যাট হাতেও তিনি ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা। ১১৭ টেস্টে ৯,২৬৫ রান করেছেন ৪৮.২৫ গড়ে। স্মিথ এই স্বীকৃতিকে শুধু তার নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার জন্যও গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন।


৫. ড্যানিয়েল ভেটোরি (নিউজিল্যান্ড):

নিউজিল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার ড্যানিয়েল ভেটোরি শুধু বল হাতেই নন, ব্যাট হাতেও ছিলেন সমান কার্যকর। টেস্টে ১১৩ ম্যাচ খেলে ৪ হাজার ৫৩১ রানের পাশাপাশি ৩৬২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। এছাড়া, ওডিআইতে ২৯৫ ম্যাচে ২ হাজার ২৫৩ রানের সঙ্গে ঝুলিতে আছে ৩০৫ উইকেট। টি-টোয়েন্টিতে ৩৪ ম্যাচ খেলে করেছেন ২০৫ রান আর পেয়েছেন ৩৮ উইকেট।

টেস্ট ক্রিকেটে ৪,০০০ রান এবং ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করা মাত্র তিন ক্রিকেটারের মধ্যে তিনি একজন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া দলের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভেটোরি তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন,‘হল অব ফেমের আগের সদস্যদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তারা কী অবদান রেখেছেন। তাদের কাতারে নিজেকে দেখতে পারাটা অভাবনীয়।’


৬. সানা মির (পাকিস্তান):

পাকিস্তানের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসি হল অব ফেমে জায়গা পেয়েছেন সানা মির। ১২০ ওয়ানডেতে সানা মির করেছেন ১ হাজার ৬৩০ রান ও নিয়েছেন ১৫১ উইকেট। আর ১০৬ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তার সংগ্রহ ৮০২ রান ও ৮৯ উইকেট। তিনি শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও একজন অনুপ্রেরণার নাম। শরীর নিয়ে কটাক্ষের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে কথা বলেছেন এবং কোভিডকালে মানুষের পাশে থেকেছেন। সানা বলেন,‘শৈশবে যখন স্বপ্ন দেখতাম, তখন ভাবতেই পারিনি পাকিস্তানে নারীদের জাতীয় দল থাকবে। আজ এই হল অব ফেমে সেই কিংবদন্তিদের পাশে জায়গা পেলাম, যাদের দেখে বড় হয়েছি। এটা অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি।’

৭. সারা টেইলর (ইংল্যান্ড):

ইংল্যান্ডের সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটার সারা টেইলর তার অসাধারণ গ্লাভসের কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন, বিশেষ করে তার লেগ সাইড স্ট্যাম্পিং ছিল নজরকাড়া। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে, সারা টেইলর ১০টি টেস্টে ৩০০ রান করার পাশাপাশি ২০টি ডিসমিসাল করেছেন। ওয়ানডেতে ১২৬ ম্যাচে তার সংগ্রহ ৪,০৫৬ রান এবং ১৩৮টি ডিসমিসাল। টি-টোয়েন্টিতে ৯০ ম্যাচ খেলে তিনি ২,১৭৭ রান করেছেন এবং ৭৪টি ডিসমিসাল করেছেন। ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডকে দুটি বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০১৭ সালের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ জয়েও সেমিফাইনালে সর্বোচ্চ স্কোর এবং ফাইনালে ৪৫ রানের ইনিংস খেলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। টেইলর বলেন,‘হল অব ফেমে নিজের নাম দেখতে পারাটা আমার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি।’

Post a Comment

Previous Post Next Post