যে কারণে আইপিএলে ফিরতে চান না অষ্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা
যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) বাকি অংশ দ্রুত মাঠে ফেরানোর তোড়জোড় শুরু করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। সব ঠিক থাকলে আগামী শুক্র বা শনিবার থেকেই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা। তবে এই পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে যে বিদেশি খেলোয়াড়রা ভারত ছেড়েছিলেন, তাদের অনেকেই ফিরতে চাইছেন না। অস্ট্রেলিয়ান বার্তা সংস্থা এএপি-র দাবি, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা বিশেষ করে এ বছর আইপিএল খেলতে আর ভারতে যেতে আগ্রহী নন।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার কারণে টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ার পরপরই বেশির ভাগ বিদেশি খেলোয়াড় আতঙ্কে ভারত ছেড়েছিলেন। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো যদিও তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে বলেছে, কিন্তু পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় এবং পরিবার পরিজনকে নিয়ে ভারতে থাকার অভিজ্ঞতা সুখকর না হওয়ায় অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যেই অনীহা দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের বেশির ভাগই এবার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আইপিএল খেলতে গিয়েছিলেন। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের একের পর এক মিসাইল ও ড্রোন হামলার খবরে তাদের পরিবারের সদস্যরা বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, তাই দ্রুততম ফ্লাইটেই তারা ভারত ত্যাগ করেন।
সিডনি বিমানবন্দরে গতকাল দিল্লি ক্যাপিটালসের ফাস্ট বোলার মিচেল স্টার্ককে তার ক্রিকেটার স্ত্রী অ্যালিসা হিলির সঙ্গে দেখা গেছে, যদিও তারা সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে যান। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের প্যাট কামিন্স ও ট্রাভিস হেডরাও পরিবার নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এই অনীহার পেছনে কেবল আতঙ্কই নয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের জন্য সামনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সূচি। চলতি বছর আইপিএল শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৫ মে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) খেলোয়াড়দের এই দিন পর্যন্তই অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্ট শেষ হতে পারে ৩০ মে থেকে ১ জুনের মধ্যে।
এএপি-র দাবি, সিএ এই বাড়তি সময়ের জন্য স্টার্ক-কামিন্সদের ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে না। কারণ, আগামী ১১ থেকে ১৫ জুন লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া। শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে জুনের শুরু থেকেই তারা প্রস্তুতি শুরু করবে এবং প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন দল জুনের প্রথম সপ্তাহেই লন্ডনে পা রাখবে। স্টার্ক-কামিন্সদের মতো জশ হ্যাজলউডও অস্ট্রেলিয়া টেস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এই পেসার পিঠের চোটের কারণে গত মাসে কোনো ম্যাচ খেলেননি এবং সেই চোট নিয়েই দেশে ফিরে গেছেন। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর খবর অনুযায়ী, হ্যাজলউড আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেরে উঠলেও এ বছর আর আইপিএল খেলবেন না।
সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এরই মধ্যে প্লে-অফের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছে এবং তাদের বাকি থাকা তিন ম্যাচ নিছক আনুষ্ঠানিকতা। তাই কামিন্স ও হেড এই ম্যাচগুলো খেলতে ভারতে যেতে চাইছেন না। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের স্কোয়াডে পাঞ্জাব কিংসের জশ ইংলিস কিংবা লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের মিচেল মার্শকে রাখা হতে পারে সেক্ষেত্রে তারাও আইপিএল ছেড়ে জাতীয় দলের প্রস্তুতিতে যোগ দেবেন। তবে যারা সিএর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের পরিকল্পনায় নেই (যেমন মার্কাস স্টয়নিস, অ্যাডাম জাম্পা, জাভিয়ের বার্টলেট, টিম ডেভিড), তারা চাইলে ফিরতেও পারেন।
এএপি আরও জানিয়েছে, শুধু খেলোয়াড়েরাই নন, আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কোচিং স্টাফে থাকা অস্ট্রেলিয়ানরাও আর ভারতে যেতে চাইছেন না। পাঞ্জাব কিংসের প্রধান কোচ রিকি পন্টিং, সহকারী কোচ ব্র্যাড হ্যাডিন ও জেমস হোপস এখনও ভারতেই আছেন। তবে লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের প্রধান কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার এবং চেন্নাই সুপার কিংসের ব্যাটিং কোচ মাইকেল হাসি আইপিএল স্থগিত হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে।
এদিকে, মৌসুম শেষ হওয়ার আগে খেলোয়াড়রা চলে যাওয়ায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো তাদের পুরো পারিশ্রমিক দেবে কিনা, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে একটা দ্বিধা। অতীতে মৌসুমের মাঝপথে বিদেশি খেলোয়াড়দের চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটায় এবারের মেগা নিলামের আগে পুরো মৌসুম খেলার নিশ্চয়তা নিয়েই খেলোয়াড়দের নিবন্ধিত করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী খেলোয়াড়েরাও নিজ নিজ বোর্ড থেকে পুরো মৌসুম খেলার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতির দায় যেহেতু ক্রিকেটার বা তার বোর্ডের নয়, তাই বিসিসিআই হয়তো ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে আরও এক সপ্তাহের জন্য ছাড়পত্রের অনুরোধ করতে পারে। তবে চুক্তি অনুযায়ী, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর স্টার্ক-কামিন্সদের মতো খেলোয়াড়দের পুরো পারিশ্রমিকই দিতে হবে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি হলেও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের অনীহা আইপিএলের বাকি অংশ মাঠে গড়ানোর প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করেছে।
এ বছর আইপিএল খেলতে ১৫ জন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ভারতে গিয়েছিলেন – মিচেল স্টার্ক, জেইক ফ্রেজার–ম্যাগার্ক (দিল্লি ক্যাপিটালস), জশ হ্যাজলউড, টিম ডেভিড (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু), গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (চোটের কারণে আগেই ফিরে গেছেন), মার্কাস স্টয়নিস, জশ ইংলিস, অ্যারন হার্ডি, জাভিয়ের বার্টলেট (পাঞ্জাব কিংস), প্যাট কামিন্স, ট্রাভিস হেড, অ্যাডাম জাম্পা (সানরাইজার্স হায়দরাবাদ), স্পেন্সার জনসন (কলকাতা নাইট রাইডার্স), মিচেল মার্শ (লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টস) ও নাথান এলিস (চেন্নাই সুপার কিংস)। ম্যাক্সওয়েল চোটের কারণে আগেই ফিরে গিয়েছিলেন, বাকিরা টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ার পর ভারত ছেড়েছেন।

Post a Comment