শেখ হাসিনার টানা শাসনের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশের মানুষ একটি ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী হয়ে গেল। তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও তার ভারতে আশ্রয় নেয়ার দু’দিন পর এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মাসব্যাপী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে সোমবার (৫ আগস্ট) পদত্যাগ করে বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতে আশ্রয় নেন সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
বুধবার (৭ আগস্ট) বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে ইসলামাবাদ। দেশে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলেও বিবৃতিতে প্রত্যাশা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রত্যাশায়।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের জনগণকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয় পাকিস্তান। এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর আগে ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ছিল নয়াদিল্লির সঙ্গে হাসিনা প্রশাসনের আপসকামী পররাষ্ট্রনীতির ছত্রছায়ায়।
এর আগে শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ২০০৯ সাল থেকে তার টানা তিন মেয়াদে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরালো হয়েছিল। সড়ক ও রেল যোগাযোগ থেকে শুরু করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সবক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক এই সময়ে দৃঢ় হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ যখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছিল, তখনও ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল যে এটি বন্ধুপ্রতীম দেশটির একটি ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’। ৭৬ বছর বয়সী এই নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করায় ভারতকে এখন ঢাকার ‘নতুন ব্যবস্থার’ সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে।
✪ আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার পতনের পর এবার বাংলাদেশ ইস্যুতে মুখ খুলল চীন: আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড়!
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সোমবার বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। বাংলাদেশে বিক্ষোভের সমর্থনকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং জামায়াতে ইসলামী নতুন সরকারে কী ভূমিকা পালন করবে তা স্পষ্ট নয়। এই দুটি দলই ভারতের বন্ধু নয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মেয়াদকালে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। অতীতে ভারতবিরোধী অবস্থানকে নির্বাচনী তকমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন খালেদা জিয়া। এ ছাড়াও অভিযোগ করেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। অন্যদিকে জামায়াতের পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভারত ঘনিষ্ঠভাবে ঢাকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্যে ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো নৃশংসতা থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা আশ্রয় নিতে পারে প্রতিবেশী দেশটিতে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি উদ্বাস্তুদের আগমন একটি মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পর, ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) আন্তর্জাতিক সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ত্রিপুরার টিপরা মোথার নেতা প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মা বলেন, তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, যেকোনো অনুপ্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে না।
ভারতের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঢাকার উত্তাল ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় কে পরবর্তীতে ক্ষমতার মসনদে বসবে সেটা দেখার বিষয় ভারতের। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে আরও বেশি জোটবদ্ধ হতে পারে। সেই সময় ঘোলাটে পানিতে মাছ শিকারের কোনো সুযোগ হাতছাড়া করবে না বেইজিং। এটি এই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মোটেও সুখবর নয়।
বিগত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে অস্থিরতা, সহিংসতা দেখা গেছে, তা শ্রীলঙ্কা হোক বা মিয়ানমার হোক কিংবা আফগানিস্তান। অন্যদিকে চীন এবং পাকিস্তান এক ধরনের জোট গঠন করেছে এবং কিছু দেশে নতুন সরকার ব্যবস্থা এনে দিয়েছে, উদাহরণস্বরূপ মালদ্বীপ। জানা গেছে তারা (বিএনপি-জামায়াত) নয়াদিল্লির চেয়ে এই ব্লকের সঙ্গে বেশি জড়িত। আফগানিস্তানে কট্টরপন্থী তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের যে দৃঢ় সম্পর্ক ছিল তা ভেঙে যায়। এর মধ্যে ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির যে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক ছিল তা গতকাল পাল্টে গেছে। ভারতকে এখন এই নতুন সংকট মোকাবিলায় নতুনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

Post a Comment